WB Govt Unemployed Scheme 2026: উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আজ আর কেবল শহরের মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলির পড়ুয়ারাও আজ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যার নাম অর্থাভাব। বেসরকারি কোচিং সেন্টারের বাড়তি খরচ, পড়াশোনার সামগ্রী, পরীক্ষা ফি—সব মিলিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যোগ্যশ্রী প্রকল্প বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রীর জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় এই প্রকল্পের আওতায় বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। NEET, JEE ও WBJEE পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিনামূল্যে কোচিং দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচিত প্রার্থীদের স্টাইপেন্ড দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যাতে কোনও পড়ুয়ার স্বপ্ন ভেঙে না যায়, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
সম্পর্কিত পোস্ট
যুবসাথী আবেদন করেছেন? টাকা পাবেন কিনা চেক করুন এইভাবে! দেখুন বিস্তারিত - WB Yuba Sathi Status Check 2026
যোগ্যশ্রী প্রকল্প কী
যোগ্যশ্রী প্রকল্প মূলত আর্থিকভাবে দুর্বল কিন্তু মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করার জন্য চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা এবং ভবিষ্যতে মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে ইচ্ছুক পড়ুয়াদের জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি উদ্যোগে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক পড়ানো, মক টেস্ট, প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের গাইডেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা একটি সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির সুযোগ পায়।
কোন পরীক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ
এই প্রকল্পের অধীনে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে—
১. NEET – মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় পরীক্ষা
২. JEE – ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকার জাতীয় স্তরের পরীক্ষা
৩. WBJEE – পশ্চিমবঙ্গের ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি কলেজে ভর্তির জন্য রাজ্যস্তরের পরীক্ষা
এই পরীক্ষাগুলিতে সফল হতে হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিয়মিত অনুশীলন অত্যন্ত জরুরি। যোগ্যশ্রী প্রকল্প সেই প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করে দেয়।
কোথায় হবে প্রশিক্ষণ
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক শহরের রাজকুমারী শান্তনাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। জেলার প্রশাসনিক উদ্যোগে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে প্রায় ৫০ জন করে ছাত্রছাত্রী নির্বাচিত হবে।
প্রশিক্ষণকালীন সময়ে নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদান, নিয়মিত পরীক্ষা এবং পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে।
কত টাকা স্টাইপেন্ড মিলবে
যোগ্যশ্রী প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল স্টাইপেন্ড সুবিধা। নির্বাচিত ছাত্রছাত্রীরা ১০ মাসের প্রশিক্ষণকালীন সময়ে মোট ৩০০০ টাকা স্টাইপেন্ড পাবেন। যদিও এই অর্থ খুব বড় অঙ্ক নয়, তবে পড়াশোনার খরচের একটি অংশ মেটাতে এটি সহায়ক হবে।
বিশেষ করে যাঁরা দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসবেন, তাঁদের যাতায়াত বা নোটবই কেনার খরচে এই অর্থ কাজে লাগতে পারে।
কারা আবেদন করতে পারবেন
যোগ্যশ্রী প্রকল্পে আবেদন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। সেগুলি হল—
প্রথমত, আবেদনকারীকে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রার্থীকে বিজ্ঞান বিভাগে পাঠরত হতে হবে।
তৃতীয়ত, ২০২৭ সালের NEET, JEE বা WBJEE পরীক্ষায় বসার লক্ষ্য থাকতে হবে।
চতুর্থত, পরিবারের বাৎসরিক আয় ৩ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে হবে।
এই শর্তগুলি পূরণ না করলে আবেদন গ্রহণ করা হবে না। ফলে আবেদন করার আগে নিজের যোগ্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
নির্বাচন প্রক্রিয়া
যোগ্যশ্রী প্রকল্পে সরাসরি ভর্তি নয়, বরং মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের একটি মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। বেশি নম্বর প্রাপ্ত প্রার্থীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচিত ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগ না দিলে সুযোগ অন্য কাউকে দেওয়া হতে পারে।
কীভাবে আবেদন করবেন
এই প্রকল্পে আবেদন করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে—অনলাইন ও অফলাইন।
অনলাইন আবেদন পদ্ধতি
অনলাইনে আবেদন করতে হলে নির্দিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, শিক্ষাগত তথ্য ইত্যাদি দিয়ে একটি প্রোফাইল তৈরি করতে হবে। তারপর লগইন করে আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথির স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে। সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করে ফর্ম সাবমিট করতে হবে। সাবমিট করার পর একটি স্বীকৃতি নম্বর পাওয়া যায়, যা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা উচিত।
অফলাইন আবেদন পদ্ধতি
যাঁরা অনলাইনে আবেদন করতে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁরা অফলাইনে আবেদন করতে পারেন। দুয়ারে সরকার শিবির বা স্থানীয় ব্লক অফিস থেকে আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথির ফটোকপি সংযুক্ত করে জমা দিতে হবে।
ফর্ম জমা দেওয়ার সময় একটি রসিদ বা প্রাপ্তি স্বীকার নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনও সমস্যা না হয়।
কী কী নথি প্রয়োজন
আবেদন করার সময় নিম্নলিখিত নথিগুলি জমা দিতে হবে—
আধার কার্ড
সম্প্রতি তোলা পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি
মাধ্যমিক পরীক্ষার মার্কশিট
পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির রিসিপ্ট
বাসস্থানের প্রমাণপত্র
প্যান কার্ড
আয়ের শংসাপত্র
বৈধ মোবাইল নম্বর
সক্রিয় ইমেইল আইডি
সব নথি পরিষ্কার ও আপডেটেড হওয়া প্রয়োজন। ভুল বা অসম্পূর্ণ নথি থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
এই প্রকল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য পেতে গেলে শুধু মেধা নয়, সঠিক গাইডেন্স ও প্রশিক্ষণও জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রামীণ বা আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
যোগ্যশ্রী প্রকল্প সেই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করছে। সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ পাওয়া মানে একই মানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ। এটি শুধু একটি কোচিং কর্মসূচি নয়, বরং সামাজিক সমতার দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আবেদনের আগে যা মাথায় রাখবেন
আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখুন—
সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন।
আয়ের শংসাপত্র বৈধ ও সাম্প্রতিক কিনা যাচাই করুন।
মোবাইল নম্বর ও ইমেইল আইডি সক্রিয় রাখুন।
আবেদনের শেষ তারিখের আগে ফর্ম জমা দিন।
স্বীকৃতি নম্বর বা রসিদ সংরক্ষণ করুন।
সামান্য ভুলের কারণে অনেক সময় আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
যোগ্যশ্রী প্রকল্প আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া কিন্তু মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও স্টাইপেন্ডের মাধ্যমে সরকার চেষ্টা করছে যাতে কোনও পড়ুয়া শুধুমাত্র অর্থের অভাবে নিজের স্বপ্ন থেকে সরে না দাঁড়ায়। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় এই উদ্যোগ শুরু হওয়ায় বহু ছাত্রছাত্রী উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যাঁরা যোগ্য, তাঁরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে সময়মতো আবেদন করুন। সঠিক প্রস্তুতি, নিয়মিত অধ্যবসায় এবং সরকারি সহায়তা—এই তিনের সমন্বয়ে ভবিষ্যতের পথ আরও উজ্জ্বল হতে পারে।
