রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প চালু করেছে সরকার। তার মধ্যে অন্যতম হল গতিধারা প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়া হয়, যাতে আবেদনকারী নিজেই আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন। শহর ও গ্রামীণ—উভয় এলাকায় পরিবহন পরিষেবা বাড়ানো এবং স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর থেকে বহু আবেদনকারী এই সুবিধা নিয়ে জীবিকা শুরু করেছেন। এখানে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হল—কী এই প্রকল্প, কত টাকা ভর্তুকি মেলে, কারা আবেদন করতে পারবেন এবং আবেদন প্রক্রিয়া কী।
সম্পর্কিত পোস্ট
মিলবে ৩০০০ টাকা সঙ্গে ফ্রী প্রশিক্ষণ, রাজ্য সরকারের এই প্রকল্প জানেন তো? - WB Govt Unemployed Scheme 2026
গতিধারা প্রকল্প কী
গতিধারা প্রকল্পের লক্ষ্য হল বেকার যুবক-যুবতীদের বাণিজ্যিক যানবাহন কিনতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। যেমন—ট্যাক্সি, ছোট বাণিজ্যিক গাড়ি, পণ্য পরিবহনের ভ্যান ইত্যাদি। গাড়ি কিনে আবেদনকারী নিজেই পরিবহন ব্যবসা শুরু করতে পারেন।
রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মোট গাড়ির মূল্যের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে দেয় এবং বাকি অংশ ব্যাঙ্ক ঋণের মাধ্যমে মেটাতে হয়।
কত টাকা ভর্তুকি পাওয়া যায়
এই প্রকল্পে গাড়ির মোট মূল্যের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। তবে একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত আছে।
ভর্তুকির পরিমাণ এক নজরে
| আবেদনকারীর ধরন | ভর্তুকির হার | সর্বোচ্চ ভর্তুকি |
|---|---|---|
| সাধারণ আবেদনকারী | মোট মূল্যের ৩০% | সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ টাকা |
| মহিলা আবেদনকারী | মোট মূল্যের ৩০% | সর্বোচ্চ ১,৫০,০০০ টাকা |
অর্থাৎ, যদি কোনও গাড়ির দাম ৪ লক্ষ টাকা হয়, তাহলে সাধারণ আবেদনকারী সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি পেতে পারেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সীমা আরও বেশি।
বাকি অর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, সমবায় ব্যাঙ্ক বা গ্রামীণ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ হিসেবে নিতে হবে।
ঋণ পরিশোধের নিয়ম
ঋণের কিস্তি এবং পরিশোধের সময়সীমা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের শর্তের উপর। সাধারণত—
- গাড়ির ধরন
- ঋণের পরিমাণ
- আবেদনকারীর আয় ও আর্থিক সক্ষমতা
এই বিষয়গুলি বিবেচনা করে কিস্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। তাই ঋণ নেওয়ার আগে ব্যাঙ্কের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা জরুরি।
কারা আবেদন করতে পারবেন
গতিধারা প্রকল্পে আবেদন করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হবে।
যোগ্যতার শর্ত
| শর্ত | বিবরণ |
|---|---|
| পারিবারিক মাসিক আয় | ২৫,০০০ টাকার কম |
| বয়স | ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে |
| এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম | নথিভুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক |
| পরিবারে সুবিধাভোগী | একজন সদস্যই আবেদন করতে পারবেন |
এছাড়াও আবেদনকারীকে বেকার হতে হবে এবং নিজের নামে বাণিজ্যিক গাড়ি কেনার ইচ্ছা থাকতে হবে।
এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম থাকা কেন জরুরি
এই প্রকল্প মূলত বেকার যুবকদের জন্য। তাই আবেদনকারীর নাম রাজ্যের এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক। এটি প্রমাণ করে যে আবেদনকারী কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় আছেন।
যদি কারও নাম নথিভুক্ত না থাকে, তাহলে আগে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া কীভাবে
গতিধারা প্রকল্পে আবেদন প্রক্রিয়া মূলত অফলাইনে সম্পন্ন হয়।
আবেদন করার ধাপ
১. নির্দিষ্ট আবেদনপত্র সংগ্রহ করুন
২. প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করুন
৩. সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পরিবহন অফিসে (RTO) আবেদন জমা দিন
৪. আবেদন অনুমোদিত হলে নির্বাচিত গাড়ির ডিলারের কাছে নথি জমা করুন
৫. ব্যাঙ্ক ঋণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন
প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আবেদনের সময় সাধারণত যেসব নথি লাগতে পারে—
| নথির নাম | উদ্দেশ্য |
|---|---|
| পরিচয়পত্র | আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই |
| ঠিকানার প্রমাণ | স্থায়ী বাসস্থান যাচাই |
| আয়ের শংসাপত্র | পারিবারিক আয় যাচাই |
| এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক রেজিস্ট্রেশন | বেকারত্বের প্রমাণ |
| পাসপোর্ট সাইজ ছবি | অফিসিয়াল রেকর্ড |
আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে সর্বশেষ নথির তালিকা জেনে নেওয়া উচিত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও প্রভাব
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার দুইটি বড় লক্ষ্য পূরণ করতে চায়—
১. বেকার যুবকদের স্ব-কর্মসংস্থান তৈরি
২. শহর ও গ্রামে পরিবহন পরিষেবা বৃদ্ধি
গাড়ি কেনার মাধ্যমে আবেদনকারী নিজেই চালক হিসেবে কাজ করতে পারেন অথবা অন্য চালক নিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। এতে নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
মহিলাদের জন্য বিশেষ সুবিধা
মহিলা আবেদনকারীদের জন্য ভর্তুকির সর্বোচ্চ সীমা ১.৫ লক্ষ টাকা হওয়ায় তাঁদের আর্থিক সহায়তা তুলনামূলক বেশি। এর ফলে নারী স্বনির্ভরতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আবেদন করার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
- নিজের পারিবারিক আয় সঠিকভাবে যাচাই করুন
- এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম নথিভুক্ত আছে কি না নিশ্চিত করুন
- ঋণের কিস্তি শোধ করার সক্ষমতা বিবেচনা করুন
- গাড়ির ধরন ও বাজার চাহিদা বুঝে সিদ্ধান্ত নিন
ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে। তাই সঠিক নথি ও তথ্য দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন ধরনের গাড়ি কেনা যায়
সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী গাড়ি কেনার জন্য এই প্রকল্প প্রযোজ্য। যেমন—
- ছোট যাত্রীবাহী গাড়ি
- পণ্যবাহী গাড়ি
- গ্রামীণ পরিবহন ভ্যান
তবে গাড়ির ধরন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদনের উপর।
গতিধারা প্রকল্প বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ। গাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি এটি একটি স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করতে সাহায্য করে। ভর্তুকি ও ব্যাঙ্ক ঋণের সমন্বয়ে অনেকেই পরিবহন ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পাচ্ছেন।
যারা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেন, তাঁদের উচিত সঠিক নথি ও তথ্য দিয়ে আবেদন করা। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে এই প্রকল্প স্বনির্ভরতার পথে বড় সহায়ক হতে পারে।
